ডাকপিয়ন

সাহেব বিবি গোলাম

তামান্না জাহান কেয়া:
দেশ পত্রিকা’য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’ লেখাটি বই হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। ইংরেজ শক্তির ভারতবর্ষে প্রবেশ এবং আড়াইশ বছরের তাদের শাসনের কালকে অবলম্বন করে বিমল মিত্রের ঐতিহাসিক উপন্যাস “সাহেব বিবি গোলাম” “কড়ি দিয়ে কিনলাম” এবং “একক দশক শতক” নামক ত্রুিস্তর উপন্যাসের প্রথম স্তর সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসটি। কালাকাল বিচারে ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কলকাতার রাজনৈতিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সংস্কৃতির দলিল। ১৯১২ সালে যখন ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয়, সেই কাল পর্যন্ত বইটার পটভূমি বিস্তৃত। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ উপন্যাস অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতার পটভূমিতে সৃষ্ট জমিদার ও বাবু কালচারের দৃশ্যবলী ও ঘটনা বিশ্লেষণের চাতুর্য ও চমৎকারিত্বে ঘটনার স্বাক্ষী যেন।
গল্পের শুরুতে ভূতনাথের সাইকেলের চাকার ঘূর্ণায়িত তরঙ্গে ক্রমে ক্রমে উদ্বেলিত হতে লাগলো তার বিস্মৃতি প্রায় কাহিনী মুখর অতীতে। হ্যাঁ, সর্বোপরি গল্পের শুরু এইভাবেই। সমস্ত অতীতকে এক লহমায় যেন চোখের সামনে চাকার মতো ক্রমে অগ্রসর হতে দেখা যায়। একদা ব্রজরাখালের অতিথি হয়ে ভূতনাথ এসে পৌঁছোয় কলকাতার বনমালী সরকার লেনের বড়বাড়িতে। কলকাতা দেখার এক তীব্র বাসনা নিয়ে ফতেপুর গ্রামের ভূতনাথ এসে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়েছিল বড়বাড়ির সদর দরজায়। সেই দরজায় দণ্ডায়মান সজ্জিত ব্রিজ সিং’কে তার মনে হয়েছিল মূর্তমান ভয়ের অংশ। এক সময়ের ঝকমকে জমিদার বাড়ির চৌধুরী পরিবারের দীনতা প্রকাশের সাথে সাথে ক্রমে ব্রিজ সিং’সহ অন্য সব চাকর যাদের জীবিকা নির্বাহ হতো সেই সময়ের কলকাতার জমিদার বাড়িতে কাজ করে যেমন সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের তোষাখানার সর্দার মধুসূদন, লোচন দাস, বিধু সরকার’ও যেন কালের ধুলোয় বিলীন হয়ে যায়। সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে বনমালী সরকার লেনের জমিদার বাড়ি ‘বড় বাড়ি’। বড় বাড়ির জমিদারির আরম্ভ কর্তা ভূমিপতি চৌধুরী। যিনি বর্ধমানের সুখচর মহকুমা থেকে উঠে এসে কলকাতায় জমিদার পত্তন করেছিলেন। বড় বাবু রাজা বাহাদুর বৈদূর্যমনি চৌধুরী সেই জমিদারির ইতিহাসকে আরো রংচং মাখিয়েছেন। মেজবাবু হিরণ্যমনি আর ছোটবাবু কৌস্তভমনি। ইংরেজ আমলের কলকাতাকেন্দ্রীক জমিদারির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যে জমিদারের সাথে তাদের প্রজাদের বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ। কলকাতায় জমিদাররা বাইজি নাচ, নৌকাভ্রমন, রক্ষিতা, ইয়ারবক্সি, পায়রা উড়ানো, গানের আসর আর সুরা পানে অভ্যস্ত হয়ে যায় আর অন্যদিকে তাদের আয়ের উৎস যে প্রজারা সেই প্রজারা তাদের মনিব’কে দেখতে পেত কদাচিৎ। যার ফলস্বরুপ প্রজাদের কাছে জমিদারের প্রতিনিধি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করতেন নায়েবরা। আর এই নায়েবের সত্যতা সম্পর্কের প্রশ্ন থেকেই যায়! উপন্যাসের বড়বাড়ি জমিদারদের সম্পর্কেও একই কথা সঠিক। তদারকির অভাবে কোষাগার যে শূন্য হয়ে পড়ছিল তার পরিনাম দেখা যায় উপন্যাসের শেষে।
এই তো গেল সমাজের একদিকের কথা অষ্টাদশ শতকের কলকাতা সমাজের আরো একটি রূপ ছিল। সেটা ছিল স্বামী বিবেকানন্দ, ব্রহ্মা সমাজ, আত্মোন্নতি সভা, অনুশীলন সমিতি থেকে যুব সমাজের মাঝে নিজ দেশকে স্বাধীন করার মনোভাব থেকে দেশকে স্বাধীন করার প্রস্তুত গ্রহণ যার প্রতিনিধি স্বরূপ উপন্যাসের “নিবারণ”। সমিতির ছেলেরা কুস্তি করতো,  মুগুর ভাঁজতো, লাঠি খেলতো আর করতো গান। -“মাগো যায় যেন জীবন চলে-
বন্দে মাতরম্ বলে।”
ব্রহ্মা সমাজের বিপরীত সুর যেন হয়ে উঠেছিল স্বামী বিবেকানন্দ ও তার অনুসারিরা। একদিকে সমাজের শিক্ষিত উঁচু স্থানীয় একশ্রেনীর মানুষ যেমন চাচ্ছিল বেদ’কে তাদের মধ্যে ধারণ করতে তেমনি স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের মহত্ত্বের বাণী নিয়ে উপস্থিত হন অামেরিকায়। তার ভক্ত হয়ে একদল যুবক’কে সে সময়ে দেখা যায় সংসারত্যাগী হতে। কলকাতায় রাজশক্তি, জমিদার শ্রেণি’র পাশাপাশি দেখা যায় আরো একটি শ্রেণি’র আধিক্য। তারা হলেন কেরানী শ্রেনি উপন্যাসের ভাষায় বলতে গেলে “গোলাম”। এরা গ্রাম ছেড়ে কলকাতাকেন্দ্রীক হতে থাকে কলকাতায় চাকরির আশায় যার ফলস্বরুপ দেখা যায় কলকাতা শহরে পরিবারহীন একশ্রেনীর মানুষকে যারা কলকাতার শহরে ভাড়া বাড়ির ঘর ভাগাভাগি করে থাকতে শুরু করে। সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের গোলাম চরিত্র’টিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে ভূতনাথ। আর সেই থেকেই কলকাতায় “বাবু সংস্কৃতি” উদ্ভব আর বিকাশ। সেই সময়ে জমিদার শ্রেণি’র সাথে এইসব নিচু শ্রেণির একধরনের সম্পর্ক দেখা যায় যেমন একদা ব্রজরাখাল ভূতনাথ’কে বলেছিল-“ওরা হলো গিয়ে সাহেব বিবি আর আমরা হলাম গোলাম। ওদের সঙ্গে অত দহরম-মহরম ভালো নয়।” এবার উপন্যাসের অন্যতম একটি অংশ “বিবি”দের নিয়ে কথা বলা যাক। কলকাতার জমিদার পরিবারের রমণীরা অধিকাংশই ছিল অসূর্যম্পশ্যা। বাহিরের সমাজের  এই যে বিরাট একটা পরিবর্তন হচ্ছে অধিকাংশ জমিদার বাড়ির বউ এবং মেয়েরা এই পরিবর্তনের কোন অংশীদারী ছিল না। বাহিরের পরিবেশ থেকে দূরে থাকতে থাকতে অন্দরমহলই হয়ে যায় তাদের জীবনের অন্যতম অংশ। যেখানে তাদের জগৎটা তৈরি হয়েছিল নতুন গহনা গড়ানো, পুতুল বিয়ে দেওয়া, ঠাকুর দেবতা নিয়ে মেতে থাকা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের বড় বৌঠান, মেজ বৌঠান আর ছোট বৌঠান চারপাশে জগৎ আর তাদের সারাদিনকার কাজ, চিন্তা ভাবনা এর থেকে আলাদা কিছু ছিল না। সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের অন্যতম একটি চরিত্র “ননীগোপাল”। উপন্যাসে সে কেবলই একটি চরিত্র নয় বরং সে প্রতিনিধিত্ব করেছে ঊনবিংশ কলকাতার এমন একটি শ্রেনিকে যারা বুদ্ধি আর একগ্রতার আঙুল তুলেছিল তথাকথিত অলস, নিষ্কর্মা আর সুরার নেশায় মগ্ন জমিদার শ্রেণির প্রতি। পরের শতকে এইসব ননীগোপালই কলকাতার মাথা হয়ে কলকাতার জমিদার শ্রেণি’র ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেছিল। ননীগোপাল’রাই যেন কলকাতার অর্থনীতির মোড় অন্যদিকে নিয়েছিল। বনমালী লেনের বড়বাড়ি জমিদারদের যখন ঘুম ভাঙ্গল এবং দেখতে পেল কোষাগার শূন্য প্রায় তারাও ব্যবসা আরম্ভ করতে চেয়েছিল কিন্তু এতদিনকার অলস মস্তিষ্ক, বনেদি বংশের হালচাল তা পারবে কেন? ঘড়িবাবু ওরফে বদরিকা বাবু’র এতদিনকার ভবিষ্যদ্বাণী বা মিথ্যা হবে কেন? টেকের ঘড়িতে দম দিয়ে দিয়ে সে অপেক্ষ করছিল ধ্বংসের সময়টায় এবং একটা সময় বনমালী লেনের বড়বাড়ি’তেও যেন ধ্বংস এসে হানা দিল। অত্যাচার, অন্যায়, অপব্যয়ের পাপ, কুড়েমির পাপে তিনটি সংসারের তিন-চারে বারোটা দেয়ালের মধ্যে বড়বাড়ির আত্মা যেন অসাড় মুমূর্ষু হয়ে পড়েছিল।
বিমল মিত্রে সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসের বড়বাড়ির ইতিহাসের সাথে সাথে কলকাতার ইংরেজ আমলের হালচাল, ইতিহাস, অষ্টাদশ আর ঊনবিংশ শতকের কলকাতা সমাজের পরিবর্তন আর বিপ্লবী, এক শ্রেনির উদ্ভব অন্যদিকে আরেক শ্রেণির পতন, সুবিনয়বাবুর বেদের নিজেকে জানার সবকয়েকটি বাণী সব কিছুর ছবি একের পর এক নিয়ে এসেছিল উপন্যাসের প্রতিটা ঘটনার মাঝে মাঝে, মোড়ে মোড়ে। কলকাতার কেন্দ্রে বসে ভারতবর্ষের এক নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছিল; জর্ব চার্নক আর লর্ড ক্লাইভের কলকাতার এ যেন এক বিস্ময়ের রূপান্তর!
অন্য আরেক লেখায় বিমল মিত্রের বাকি দুই ঐতিহাসিক উপন্যাস কড়ি দিয়ে কিনলাম এবং একক দশক শতক নিয়ে কথা বলা যাবে। হয়তো সেখানেও দেখা যাবে আমাদের চিরচেনা জগতের অন্য আরেক সময়কার গল্প, মানুষদের সংমিশ্রণ’সহ আরেক অনেক অনেক কিছু।

আরও পড়ুন...

বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করল এনবিআর

admin