ডাকপিয়ন

ছবির দেশে, কবিতার দেশে

তামান্না জাহান কেয়া:

ভ্রমণ করতে কার না ভালো লাগে? প্রতিদিনের চিরচেনা আর অভ্যস্ত পরিবেশের থেকে বের হয়ে নতুন কিছুর আস্বাদন করার রোমাঞ্চ আর নতুন কিছু দেখার তীব্র ইচ্ছা নিয়েই হয়তো মানুষ বের করে নিয়ে আসে নিজের চিরচেনা জগৎ থেকে। নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেয় সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশের নতুন এক প্রকৃতির সাথে। সেখানে হয়তো তার সাথে দেখা দেয় নতুন মুখ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন খাদ্যাভাস, নতুন প্রকৃতি’তে বসে দুই দন্ড নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও তার হয়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে মানুষ হওয়ার ফলস্বরুপ মানুষ চায় তার জীবনের অনেকটা সময় প্রকৃতির সাথে কাটাতে। আর তাই নতুনত্বের আস্বাদনে সে বেড়িয়ে পড়ে বিশ্বভ্রমনে। পৃথিবীর সব দেশের আর ভাষার লেখকের মধ্যেই ভ্রমনের ইচ্ছার তীব্রতা দেখা যায়। তাদের এই ইচ্ছা ফলস্বরুপ’ই যেন প্রায় প্রতিটি ভাষায় পাওয়া যায় অসাধারণ সব ভ্রমণ-কাহিনী। এক মলাটের ভেতরে যেন পাওয়ার যায় না দেখা পৃথিবীর কী আশ্চর্য সব বর্ণনা।

বাংলা ভাষায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পরিচিত তার লেখা উপন্যাস, গল্প, কবিতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই লেখাগুলোর পাশাপাশি তিনি লিখে গিয়েছেন অসাধারণ সব ভ্রমণ কাহিনী। তার অন্যতম একটি হচ্ছে “ছবির দেশে কবিতার দেশে” বইটি। ভ্রমণকাহিনী নিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন-“খুব ছোটবেলা থেকেই আমার ভ্রমণের নেশা। সব সময় মনে হতো, এই পৃথিবীতে জন্মেছি, যতটা পারি দেখে যাবো না? কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও পয়সা তো ছিল না, তাই জমানো কুড়ি-তিরিশ টাকা হাতে পেলেই চলে যেতাম কাছাকাছি কোথাও। এক সময়ে জাহাজের নাবিক হবারও স্বপ্ন ছিল আমার। তা অবশ্য হতে পারি নি। তবে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গেছি কয়েকবার।”

‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটি প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৯১। বইটি প্রকাশ করেন কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স। এই ভ্রমণ কাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছে আমেরিকা থেকে। এরপর ফ্রান্স, ইতালি, মিশর প্রায় ইউরোপের অনেকটা জায়গা জুড়েই বইটার বিস্তৃত।

না, লেখক হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটিতে দেশের প্রশস্ত বর্ণনা কিংবা কোন দেশের ইতিহাস আর বিখ্যাত কোন জায়গা নিয়ে তার বিস্তৃত বর্ণনা করেন নি। লেখক অনেকটা নিজের চোখে যা দেখেছেন তাই যেন লিখেছেন বইটিতে। বইটির আরো অাকর্ষনীয় বিষয় হচ্ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ফরাসী দেশের শিল্প আর শিল্পীদের নিয়ে অসাধারণ বর্ণনা রেখে দিয়েছেন। বইটা যেন অর্থ্যাৎ ভ্রমণকাহিনী’টি ফরাসীদেশকে কেন্দ্র করে। বলা হয়ে থাকে যে প্রত্যেক শিল্পীই যেন দুইটি মাতৃভূমি। একটি যেখানে সে জন্মেছে এবং অন্যটি হ্যাঁ ফ্রান্স। এই ফরাসি দেশে যেমন ছিলেন দেগা, মোনে, রেনোয়া, বোদলেয়ার, মাতিস, অ্যাপোলিনিয়ার মতো প্রভৃতি লেখক এবং শিল্পীর সমাহার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যাকে আরো কাছ থেকে ফরাসী দেশ এবং ফরাসী ভাষা, দেশের শিল্পী, সংস্কৃতি, মানুষকে চিনিয়েছেন তার প্রতি কাছের মানুষ মার্গারিট। সময়ের সাথে সাথে মার্গারিট ব্যক্তি মামুষটি হারায়ে গেলেও তিনি কখনই বিস্মৃতি হয় নি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতি থেকে। কিছু কিছু চরিত্র কিংবা ব্যাক্তি মানুষ থেকে যেন চিরপরিচিত হয়ে মার্গারিট যেন তেমনই একটা চরিত্র কিংবা ব্যক্তি মানুষ।

‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণনা করেছেন ফরাসী দেশের শিল্প সংস্কৃতির স্রষ্টাদের এবং তাদের শিল্পকর্মের। ফরাসী দেশের বিখ্যাত আড্ডার বর্ণনা পাশাপাশি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বর্ণনা করেছেন প্যারিসের কাফে গেরবোয়ার আড্ডাটির বিশেষত্ব যে এখানেই প্রথম শিল্পীদের সাথে কবি ও লেখকদের মিলন ঘটে। এই ক্যাফের বিবরণে উঠে এসেছে শিল্পী এদুয়ার মানে, সমালোচক শার্ল বোদলেয়ার, ঔপন্যাসিক এমিল জোলা, শিল্পী পিসারো, রেনোয়া, ক্লদ মোনে, সেজান্ প্রভৃতি গুনি মানুষের ছোট ছোট বর্ণনা। আড্ডাদারীদের ছিলেন বিচিত্র পোশাক, বিভিন্ন ধরনের মেজাজ তবুও তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মিল হয়তো ছিল তারা সকলেই শিল্পী। মনের ভাবকে ফুটিয়ে তোলার অসম্ভব আগ্রহ প্রতিটি মানুষের মনে, চিন্তায়, কাজে।

বই এর প্রতিটি অধ্যায় তেমনই আরম্ভ হয়েছে তাদের সৃষ্ট কবিতার ছোট ছোট বাংলা অনুবাদ দিয়ে। তার সাথে সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যের প্রথম জীবনের নানা ঘটনা, বন্ধুপ্রভন ফরাসীদেশের নানা ছোট ছোট কাহিনী সন্নিবেশিত হয়েছে।

এক কথায় অন্যবদ্য বাংলা ভাষায় এক ভ্রমণ কাহিনী বই ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইটি। শুধু ভ্রমণকাহিনী নয় ফরাসি দেশে উচ্চ শিল্প সংস্কৃতি বর্ণনা বইটাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। পড়তে পড়তে মনে হবে লেখকের সাথে সাথে ফরাসি দেশের রাস্তা, পার্ক, মেট্রো আর মিউজিয়াগুলোতে ব্যক্তি আমিও ঘুরে বেড়াচ্ছি। এত সাবলীল আর এত সুন্দর প্রতিটি বিষয়ের বর্ণনা।

‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বই নিয়ে কথা বলা আজকে এখানেই শেষ। অন্য কোথাও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম আরেক ভ্রমণ কাহিনী ‘পায়ের তলায় শর্ষে’ বই নিয়ে কথা বলা যাবে।

“অ্যালবাট্রস, সমুদ্রের বিশাল বিহঙ্গ, যেন অলস

ভ্রমন-সঙ্গী, জাহাজের পিছু পিছু ওড়ে

গভীর থেকে গভীরে যায় জাহাজ, তারাও সঙ্গে সঙ্গে যায়

নাবিকেরা এক একসময়ে তাদের বন্দী করে

খেলাচ্ছলে।” – শার্ল বোদলেয়ার।

আরও পড়ুন...

এলো খুশির ঈদ

ঝলক গোপ পুলক

আদর্শের মৃত্যু নেই

news dakpiyan

তুমি এসেছিলে বলে

ঝলক গোপ পুলক