ডাকপিয়ন

ডাকপিয়ন ঈদ সংখ্যা ” আনন্দমেলা “

গল্প: 

বদলে যাওয়া আনন্দের রঙ

রুমা মোদক

আমার অনেক ঈদ ছিলো। কৈশোর থেকে যৌবন। সেই বৃত্তান্ত বলি, আর বলি আমার ঈদ হারিয়ে যাবার বৃত্তান্ত।দুটোরই বড় অবশ্যম্ভাবী আগমন জীবনে। তারও আগে যে সত্য স্বীকার্য একটা বয়সে যে উৎসবে নতুন জামা জুতোর রঙ, নির্ঘুম অপেক্ষা,বালিশের নিচে জুতো নিয়ে ঘুমানো আর রান্নাঘরে মায়েদের রাতভর সেমাই পিঠা তাই ঈদ তাই উৎসব। এই রাতজাগা আনন্দে  যতোদিন ঘুম টুটে টুটে যায়, ততোদিন উৎসব রঙীন।
যে উৎসবে একটা বয়সে প্রেমিকের ইশারার গোপণ শিহরণ নেই, যে উৎসবে প্রেমিকের নতুন পাঞ্জাবীর ছায়া ধাওয়া করে না দিনমান, সে উৎসবে কোনোই রং নেই। প্রেমিকের  ইশারা আর পাঞ্জাবীর ছায়া হৃদয়ে মেখে নেয়ার মনটা যতোদিন জেগে থাকে, ততোদিন উৎসব রঙীন।
তারপর এক বয়সে দারা-পুত্র-পরিজনের হাসিতে থাকে উৎসবের আনন্দ। উৎসব মানে তখন ঘরে ফেরা, স্মৃতির কাছে ফেরা,শৈশব কৈশোরের কাছে ফেরা। পেশার প্রয়োজনে যে শিকড় ফেলে যাওয়া উৎসবের আয়োজনে তাতে সার-জলের সিঞ্চন। জীবনের বাস্তবতার ডাল পাতায় সতেজ সবুজ প্রাণের স্পর্শ লাগিয়ে আবার কর্মব্যস্ততায় ফিরে যাওয়া। কে না জানে এই একদিনের উৎসব আয়োজনের দিনই বারবার আনন্দ ফিরিয়ে নিয়ে আসার অপেক্ষায় বাঁচিয়ে রাখে বছরের বাকি দিন।
আর উৎসব রঙীন জেগে থাকে অপেক্ষার আয়োজনে প্রৌঢ় প্রৌঢ়ার জীবনে। জীবনের অক্লান্ত যুদ্ধ শেষে যাদের অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার নেই আর।
এই যে প্রায়শই  বয়স্করা বলেন ঈদের আনন্দ নেই, আসলে তাদের প্রেমের মনটা মরে গেছে। স্বীকার করুন কিংবা না করুন ভেবে দেখুন, সব আছে ঠিকঠাক, কিংবা বেড়েছে আয়োজন। পোশাকের, খাবারের, মিডিয়ার, উদযাপনের সব রঙীন হয়েছে বহুগুন।কেবল বদলে গেছে উৎসবের রং। একজনের কাছ থেকে চলে গেছে অন্যের কাছে। উৎসব রং হারায়নি। হারায়না তার রস কিংবা উল্লাস। কেবল হাতবদল হয় তার। একই বয়স আর বরং বহু বর্ণিল রং নিয়ে উৎসব অপেক্ষা করে থাকে নব বোধনের নব বৈচিত্রের। আমরা বুড়িয়ে যাই, ক্ষয়ে যাই বয়সের ভারে, চামড়ার ভাঁজে, পাকা চুলে। উৎসব চিরযৌবনা কালের সবচেয়ে আধুনিক গন্ধ গায়ে মেখে সে দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ার মোড় থেকে সিনেফ্লেক্স কিংবা পাঁচতারায়। কোথাও অনভ্যস্ত বেমানান নয় সে কোনো কালেই নয়।
আমাদের কৈশোরে এই মফস্বলের বাতাস সকাল থেকেই ভাসতো আতরের গন্ধসাগরে। আমার বাড়ির পাশেই সওদাগর জামে মসজিদ।ঘুম ভাঙতো মাইকের আহবানে। সওদাগর জামে মসজিদে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রথম নামাজ বেলা ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে……। তখনই বাতাস ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে থাকে আতর আর পাটভাঙা পাঞ্জাবীর ঘ্রাণে। রাস্তার পাশে, মসজিদের পাশে আমার ঘর বর্ণিল হয়ে ওঠতে শুরু করতো উৎসবের রঙে। সারাবছর যে ছেলেটি খাতা বই নিয়ে কেবল টিউশনি মাস্টারের বাড়ি দৌড়ায়,এদিক সেদিক তাকানোর ফুসরতই নেই, সেও আজ ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো বাঁকা হাসি আর ইশারা নিয়ে তাকায়। ঈদ মানে উৎসব, উৎসব মানে আনন্দ, আনন্দ মানে শিহরণ, ভালোবাসার শিহরণ।
জন্ম পরিচয়ে হিন্দু বলে ঈদে বিশেষ নতুন জামা টামা জুটতো না। রোজার ছুটির আগে দিয়ে রাখা বন্ধুদের আমন্ত্রণে বিকেলে পুরানো জামাতেই যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রায়শই পরিবার থেকে অনুমতি মিলতো না, একা একটা মেয়ের। ককদাচিৎ মিলতো কোনোবার, সন্ধ্যা নামার আগে আগে ফিরে আসার শর্তে। সে এক স্বর্গীয় বিকেল যেনো বা, এ বাড়ি- ও বাড়ি! কতো অপেক্ষা প্রান পেতো সেই বিকেলে, শুরু হতো কতো লাইলি-মজনু উপাখ্যান। সেমাই- পিঠে পুলির ভাঁজে ভাঁজে হয়তোবা লুকিয়ে আছে সেই ইতিহাস।
আমাদের ঈদ আসতো সাদাকালো টিভিতে কেবলই কিছু বিশেষ দেখার অপেক্ষায়। কদিন আগে থেকেই দেখাতো বিজ্ঞাপন আর আমাদের অবরুদ্ধ অপেক্ষারা অধীর হতো, অধীর হতো। এ অপেক্ষার তুলনা নেই। এর তূল্য আনন্দ আয়োজন আর পাইনি এ জীবনে। ঈদের রাত, আর রাতের আনন্দমেলা, নাটক…..জুয়েল আইচ, আনিসুল হক, আফজাল হোসেন আবু সাঈদ আব্দুল্লাহ আর রোকন দুলাল জবা কুসুমের মা তারপর দখল করে থাকতো কয়েক মাস। আলোচনা আড্ডা। আমাদের সেকালের ঈদের এইসব অপেক্ষার আনন্দ অনুবাদ করতে পারে কী একালের রিমোটের প্রতিটি সেকেণ্ড  কিংবা ফেইসবুক,হোয়াটস আ্যাপে যোগাযোগের বাহুল্য! অসম্ভব।
আমার জীবনে ঈদ আসতো,হলের দাদু এসে নোটিশ বোর্ডে নোটিশ লাগিয়ে দিতো আর ডিপার্টমেন্ট এর সেমিনার রুমের সামনে। হলে ফিরে শুরু হতো গোছগাছ। শানুর সাথে নিউমার্কেট, গাউছিয়া ঘুরে বেড়ানো সারাদিন। এটা ওটা কেনা বাসার জন্য,হয়তো দুই গজ কাপড় কিংবা ছোট্ট একটা শো পিস। রোজাদার শানু এক ফাঁকে কোন পর্দাঘেরা রেস্টুরেন্টে বসে জোর করে আমাকে খাইয়ে নিতো। রোজাদার মানুষটি চুপচাপ বসে থাকতো সামনে। আমি প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে মুখে তুলতাম ধনে পাতা দেয়া নলা মাছের ঝোল। শানুর চাপাচাপি এড়ানো কঠিন।আহা আমাদের সেই সব হিন্দু হিন্দু, মুসলিম মুসলিম না ভাবা দিন। প্রচণ্ড শীতে আঁধার ভোরে শানু বিলকিস লেপের নিচ থেকে টেনে নামাতো ভোরবেলা, আমাদের সাথে খাও রুমাদি….আমি আরো লেপের উষ্ণতায় লুকিয়ে বাঁচাতাম নিজেকে।
তারপর সায়দাবাদ থেকে বাড়ি আসার টিকেট নিয়ে আসতো একজন। সবাই পঞ্চান্ন-ষাট টাকা দিতাম তার কাছে। দুটিই মাত্র বাস হবিগঞ্জে ফেরার। অগ্রদূত আর বিসমিল্লাহ। হবিগঞ্জের সবাই একসাথে। প্রায় সময়, সন্ধ্যায় বাকি পথটুকু একা ফিরতে হবে বলে থেকে যেতাম শানুর চুনারুঘাটের বাসায়। বাসগুলো তখন চুনারুঘাট হয়ে হবিগঞ্জ আসতো। তখনো হাইওয়ে হয়নি। একটা ময়না ছিলো শানুদের বাসায়। এ্যানির সাথে ছড়া কাটতো,মেজপা আইছইন। মেজপা আইছইন। আর সুমন, এই যে এখন ব্যারিস্টার সুমন লাইভে কথার ফুলঝুরি ছুটায়, আমাকে দেখে লজ্জায় লুকিয়ে পড়তো টেবিলের তলায়।  সোহাগ পরদিন লোকাল বাসে আমাকে পৌঁছে দিতো হবিগঞ্জ।
ছুটিতে একসাথে ফেরায়, একটা উপহারের অপেক্ষা কিংবা ক্যাম্পাসের উদারতাহীন ক্ষুদ্র মফস্বলে ঈদের দিনে একনজর দেখা! এক একটা ঈদের জন্য কী উন্মাতাল অপেক্ষা। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঈদগুলি। একটা সামান্য লিপস্টিক কিংবা একটা বডি স্প্রে উপহারে যেনো সাত রাজার ধন সম প্রাপ্তি থাকতো লুকিয়ে।  এর চেয়ে অধিক কোনো প্রাপ্তি প্রত্যাশা ছিলোনা। তারচেয়ে বরং অধিক কাঙ্ক্ষিত ছিলো একনজর দেখা! ক্যাম্পাসের সহজলভ্যতা অধিক তৃষ্ণায় কাতর হতো এই মফস্বলের ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধতায় একনজর দৃষ্টি বিনিময়ে….। শাহানার বাসা। মাছের পিঠা আর ভাবির স্পেশাল পুডিং ছাড়া ঈদ হয়? হয়েছে কখনো? আমার ঈদ মানেই শাহানার বাসা।
তারপর চলে গেছে কতো আহ্নিকগতি বার্ষিকগতির দিন-রাত, জোয়ার-ভাটার বছরের পর বছর! আমাদের বিটিভির অপরিমেয় নির্ভেজাল আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ঈদের পঞ্চম দিন ষষ্ঠদিনের  গুনহীন মানহীন হুল্লোড়।  আমার জীবনকে ফাঁকি দিয়েছে ঈদের আনন্দ। বন্ধুরা সব প্রতিষ্ঠিত স্বাবলম্বী। হাজার টাকার উপহার আসে, তবু সেই একটা লিপস্টিক কিংবা বডি স্প্রে পাবার শিহরণ কই?
আমি জানি এই সময়ে প্রতিটি নরনারী যে পেরিয়ে এসেছে কৈশোর কিংবা যৌবন, ঈদ কাটে তাদের নস্টালজিয়ায়, স্মৃতিতে আর রোমন্থনে।
ঈদ আবার ফিরে আসে দেখি চতুর্পাশে বেশ কয়জন প্রৌঢ় আর প্রৌঢ়ার জীবনে।আমি দেখি নিঃসঙ্গ বাড়ি আগলে পড়ে থাকা জনক জননী। সারাবছর কেবল মোবাইলে, ইমোতে কথা বলা নাড়িছেঁড়া ধনের আকুল অপেক্ষা এই একটি উৎসবে। তার আগে আচার দেয়া, পাপড় দেয়া, পিঠে-পুলির আয়োজন। ঈদ তাদের রঙীন হয়ে ওঠে সারাজীবনের সার খুঁজে। তারা হয়তো জানেন হয়তো জানেন না, কিংবা জেনেও বুঝেন না ছেলে-নাতি-নাতনিরা পিঠে-পুলির স্বাদ কবে ভুলে গেছে। আনন্দ পাড়ি জমিয়েছে রান্নার চুলা থেকে ফাস্টফুডের টেবিলে। তবু ক্লান্তি নেই প্রৌঢ় প্রৌঢ়াদের। চুলায় রান্না চাপাতে চাপাতে, আচারের বৈয়াম রোদে শুকাতে দিতে দিতে তাদের দৃষ্টি পড়ে থাকে পথের ধারে……ঈদের আনন্দ আসে সেই পথ বেয়ে।
এই ঈদে পত্রিকা মিডিয়ায় কেবলই খবর হয়, শেকড়ের টানে খালি হয়ে যাচ্ছে রাজধানী। কিন্তু খালি হওয়া রাজধানী এসে যেখানে জমায়েত হয়, সেই মফস্বলগুলো যেনো এই ঈদে এক একটা জমাট কার্নিভাল। অভূতপূর্ব বর্ণিল রঙ এর। পেশার টানে, জীবিকার টানে দেশে কিংবা দেশের বাইরে থাকা মানুষগুলো এই উৎসব কেন্দ্র করে ছুটে আসেন নিজ শহরে কিংবা গ্রামে। পাড়ায় মহল্লায় দোকানে মার্কেটে চায়ের স্টলে জটলা জটলা আড্ডা। সারাবছর নীরবতার গাঁজায়  ঝিমুতে থাকা মফস্বলগুলো হঠাৎ যেনো গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ায় ঝলমলে প্রাণসজীবতায়। বাড়ি বাড়ি, ঘরে ঘরে যেনো প্রানের স্পর্শ ফিরে আসার স্পন্দন। আত্মীয়-পরিজন, নাওঈরী-ঝিয়ারি, বন্ধু- বান্ধবে গল্পে, গুজবে, পূনর্মিলনে মফস্বলগুলো যেনো গরবে ঝলমল করে। কতো কৃতি সন্তানের জন্মদাত্রী সে। যারা বারবার নাড়ির টানে ফিরে ফিরে আসে।
ঈদ কী সীমাবদ্ধতায় আর কেবলই সীমাবদ্ধ নয় শুধুই ধর্মীয় আচরণে। সবকিছুর উর্দ্ধে পারস্পরিক আত্মার মিলনে এক অন্য মাত্রা পেয়েছে এই মাটিতে। শিকড়ের টান এক অমোঘ টান হয়ে এই উৎসবকে দিয়েছে সার্বজনীন ঐতিহ্য।

রম্য গল্প:

কম্পলিমেন্ট

অর্ণি শওকত ছোঁয়া

আজ আমার ব্রেকাপ হয়েছে। ব্রেকাপের কারণ সবার কাছে তুচ্ছ মনে হলেও আমার কাছে তা অনেক ভারী। আজ সবুজ রংয়ের এক শাড়ি পরে গিয়েছিলাম দেখা করতে। যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমাকে দেখতে কেমন লাগছে? বললো, “মনে হচ্ছে একগাদা থানকুনি পাতা। কি সুন্দর।”
এটা কোন ধরনের কমপ্লিমেন্ট? কার প্রেমিক এমন কমপ্লিমেন্ট দেয়?
তার কমপ্লিমেন্ট দেবার ধরণ দেখলে গা জ্বলে যায়। একদিন সে আমাকে বলেছিল, “জানো তুমি যখন বাসে আমার কাধে মাথা দিয়ে ঘুমাও তখন তোমাকে দেখতে ডলফিনের মত লাগে, যদিও আমি কখনো ঘুমন্ত ডলফিন দেখিনি কিন্তু আমার কল্পনায় একদম তার মত লাগে তোমাকে”।

বাসায় এসেই বাবাকে কল দিলাম। দিয়ে বললাম তোমার কোন বন্ধুর ছেলে নেই? বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কেনো? বললাম বিয়ে করবো। বলেই মাথায় পানি ঢালতে গেলাম। মা ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
আমারও এক রুচি। যেই ছেলে বলতে পারে তোমার চোখ দুটো আমাদের ছাদে পালা মুরগির মত তার সাথে প্রেম সম্ভব না। কোন মুরগির চোখে কাজল আর লাইনার দেওয়া থাকে?

বাবা সন্ধ্যায় বাসা এলেন। এসেই কিছু বলবেন তার আগেই বললাম, ” ছেলে আছে?”
বাবা চুপ করে রইলেন। মা এসে বললেন আমি নাকি পাগল। তার স্বামীও নাকি পাগল। তার কাছে সে বাদে সবাই পাগল।
আজব তোহ। মেয়ে বিয়ে করতে চায় এই বিষয়টা তোহ আনন্দের।এরা এমন করে কেনো?

বাবা জিজ্ঞেস করলেন কি হলো?খুলে বললাম সব। বাবা সব কথা শুনে আমার মাথায় হাত রাখলেন।মা দেখলাম শুনে একটা ঝাড়ি দিয়ে চলে গেলেন রান্নাঘরে। মা আজীবন এটাই করেন।

মিনিট দশেক পর বাবা আমার মাথা বুকে টেনে নিয়ে নিলেন। বাবা আমাকে বললেন, “জানিস মা বিয়ের রাতে তোর মাকে একটা গান শুনিয়েছিলাম। আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখবো। কি সুন্দর মুহূর্ত। এমন সময় তোর মা বললো, ” জানেন আপনি না দেখতে খুব আদুরে। একদম আমাদের বাড়ির ছাগলের বাচ্চাটার মত”।

এক বড় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে রুমে চলে আসলাম।ফোনটা খুঁজে কল দিলাম তাকে।১৫টা মিসডকল। আমি হ্যালো বলার সাথে সাথে সে বললো,
“আসলে থানকুনি পাতার গুচ্ছ না, তোমার শাড়ির রং ছিল কলমি শাকের মত। একদম একটা ভিটামিন ভিটামিন ভাব ছিল তোমার চেহারায়। যাইহোক তুমি আজকে রেগে গেলে কেনো? সারাদিন ফোন ও ধরলেনা যে.”।

 

কবিতা:

ক্রুশকুসুম

পিয়াস মজিদ

আমিই আনন্দম, ক্রুশের মিনার। আকাশেরও মগডাল থেকে দেখি কোথায় তুমি -চোরাগোপ্তা ফুল। তুমি তো কাননে নও। কবরখানায় নৃত্যরত লাবণ্যপ্রেত। তোমাতে প্রেম ঢালি। তুমি আজ হাড়ে গলা মোম। আর এমতে কৃষ্ণনিখিল চুরমার। আয় ধ্বংস, আয় সবুজ। চাঁদ ডুবল যায় করুণ রসধারায়। আবার তুমি মা মেরিতে ছেয়ে গেছ; জেরুজালেমে খড়ের গাদায়। রাত গাঢ় হলে তুমি সোনালি রক্তের জতু। যখন বনভূমি দগ্ধ শৈত্যে, জল ডুবন্ত ঘৃণায়। এই পথ কাঁটাশোভা, এই পথ যিশু। আজ ঝরে পড়ে সমুদয় সিডারের গাছ। তুমি তবে নবরূপে রোপিত বিষাদ। তার ছায়ামূলে আমি সংগীতের রিমঝিম জলসা বসাই।
সেথা দেখো কেমনে অসুর ঘনায়!

 

খাবার গরম করে খাওয়ার নাম ধর্ম

অনির্বাণ সূর্যকান্ত 

১)
সামনের দিকে ছুটে চলছে, চলছে সামনে, পেছনে প্রেমিক মিছিলে যাচ্ছে। দাবি আদায় করে ফিরবে মৌমাছির মধু নিয়ে। এখন খুব প্রদীপকাল, আলোহীন প্রদীপের নিচে জলচোখ । গোলাপের সুত্র মুচি বোঝে না। বিড়ালের চোখ। যতটুকু পরকীয়া ততটুকুই জল পাবে পৃথিবী। ভাতের বুকে যতটুকু ঝোল ।

২) হুস করে যে ছুটে গেলো তাঁকে ডাকলে তার পেছনে পেছনে যাওয়া দমকা হাওয়া ফিরে আসে না। আসে উচ্চাঙ্গ গরমের বার্তা । জমজমাট কুরিয়ারে আসে উচ্চতর সাম্প্রদায়িক যত মেঘ। চুড়িদার বলতে পান চিবুনি ঠোঁট যে প্রতিবেশী মেয়েটির নামে সেফটিপিন দিয়ে গেঁথে রাখে।

৩) চাঁদের হাসি ছাঁদে বিছিয়ে দিলে বারবার ছাঁদে যেতে ইচ্ছে করে। দড়ি ভরে কতগুলো হাত ছড়িয়ে দিয়েছে গোপন পোশাকের গোপন কথা। খুব গরম। তবুও অদৃশ্য। তাঁদেরকে ট্রাফিক বোঝানো যায়না। ছাঁদে সিনেমা , সিনেমার টিকেট সিনেমা বোঝে না।

৪) পোষা বিড়ালটা মা হয়েছে , মা হওয়ার পর শরীরে পর্যটন কেন্দ্র থাকে না। প্রকৃত পাতা দিয়েই সন্তান দুধ খায়। পাতা যাকে বলি। মুগ্ধতা । কবিতা হওয়ার আগে কবি। বুকে দুধ আসার পর মা। বুকের দুধ যে পাখির নেই তার আছে আওয়াজ ।

৫) শরীরে বৈদ্যুতিক তার, স্নান কর, কোনো তড়পানো নেই। এখন দুপুরবেলা ব্রেকআপ , অন্নপ্রাশনে ভিজে যাচ্ছে অন্ন । শুধু রঙ চিনেনা বলে অন্ধ। কচি পাতা কুপির আগুনে ধরে কাজল। আর লিপে কাঠি রাখলে লাল। লিপস্টিক ঠোঁটে রাখলে বাঁচে । বেঁচে থাকা একেই বলে যার মেরুদণ্ড ঘানি টেনে বেঁকা। আর স্ক্রিনশট নিজে এক আততায়ী , কোন এক স্ক্রিনে আড়ি পাতে ফুটন্ত শরীরের পাশে ।
৬) পায়ের নিচের মাটি আলগা হয়ে আছে, সেখানে জাগানোর কিছু নেই,ব্রণ ফুলে জোনাকি বের হবে।দানাপানি নিয়ে ঢুকছে রাজধানী এক্সপ্রেস, শেষ রাতের ব্লিডিং পরে আছে মোজাইক পাথরে।যত বেশি শীত ততবেশি সাংবাদিক ছুটছে তলা শুকতে। মাতালের বমিতে গন্ধ নেই যতটা লিখি ইয়োরস মোস্ট অবিডিয়েন্ট দ্যা পিপলস রিপাবলিক অফ বাঙলাদেশ।

৭) না নেই, মাথায় তেল দিচ্ছে তেল আছে যার, যে নিচ্ছে তারও আছে বিকিনি। কামুক নয়, পুকুর অনেক থাকলেই কি! আরো খনন করে দেখতে হয় রাজত্ব,
ক্যাসেটে গান মিশে থাকে, প্লে- শব্দ পুড়তে পুড়তে গান।টেলিফোন- বিন্দু বিন্দু স্টেশন ছেড়ে যায় সব স্টোভের বাস্প। আবহাওয়াতে হাওয়া হাওয়া জুড়ে দাও। জেগে আছি বলেই সাড়া দিতে বাধ্য নই। পাশে আছি বলেই জাপ্টে ধরবে?

৮ ) মানুষ সমুদ্র পোষেনা, পুকুর খনন করে সমুদ্র খনন করেনা। সমুদ্রে খনন করে। সমুদ্র থেকে সব অতীত বের হবে। সোফায় বসে ভাবছিলাম হেরোইন ও হিরোইন। দুপুরের ফ্ল্যাটে যে গোলাপ উদোম ফ্রয়েড ভালোবাসে সেখানে দোলপূর্ণিমা লাগিয়ে দেবো।রুটি ক্লান্ত হলে প্রোটিন উড়ে যাবে, বসন্ত হলে যৌনতা। ক্যামেরার রিল খুলে বাউল গায়না জিন্দাবাদ। আমার আঙুল শাড়িগ্রাফিতে মহাকাশ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

 

অভ্যাস

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য 

পুব আর পশ্চিমে দুটো জানলা রেখেছি ঘরে
সূর্যমুখীর ফুলগুলি সূর্য হওয়ার পর জানলা খোলাই থাকে
সকাল-সন্ধে জানলায় ঘুরে ঘুরে ভুলে গেছি দরজার কথা
এখন দরজা খুলি না আর
ফলত দেয়াল থেকে ধীরে মুছে যাচ্ছে দরজার মায়া
এই অভ্যাসে কোনো পতঙ্গের ঘুমে নিশব্দ হয়ে গেছি
প্রেম এসেছিলো কোনোদিন টকটলে লাল—মৃত্যু যেমন
পাতার শিরায় তাকে কাঁপতে দেখে ছুঁতে গেলাম
পাতা সে অদ্ভুত মোহের খেচর—
উড়ে গেলো শাদা, যে-পথে আরো গেছে স্বপ্ন ও স্মৃতি
তবু অভ্যাসে ঘুরি ঘরের ভিতর।

 

জীবনব্যধি

সৈকত আমিন

আমরা প্রত্যেকেই প্রেমে পড়েছিলাম
কারণ আমাদের মৃত্যুর প্রয়োজন ছিল,
এবং যত ঘাতক’কে আমরা চিনি-
তারা সকলেই শিশুদের মুখ ছুয়ে
শপথ করেছিল হত্যাকে ঘৃণা করার।

আমরা প্রত্যেকেই প্রেমে পড়েছিলাম
যেহেতু পূর্বসূরিদের পাপের ফলে
জন্মের মতো জীবনব্যাধি
আক্রান্ত করেছিল আমাদের,
আমরা ভেবেছিলাম ভালোবাসা’ই বোধহয়
সুস্থ হবার শেষ হাসপাতাল,
আর প্রেম’কে রোগীবাহি অ্যাম্বুলেন্স ভেবে
পথে দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করেছি বহুকাল,

মূলত আমরা বোকা ছিলাম,
আমরা জানতাম না এই অ্যাম্বুলেন্স
কারো জন্য কোথাও থামবে না কোনোদিন।

তবু পথরোধ করে দাঁড়িয়ে
অ্যাম্বুলেন্সের আঘাতেই আমরা
তন্দ্রা ও জাগরণে আহত হয়েছি বারবার।

আমরা আমাদের ভুল তখনো বুঝতে পারিনি।

এরপর সমগ্র জীবন শুধু
অপেক্ষার আক্ষেপে ভাসতে ভাসতে
হাহাকারের হাসি হাসতে হাসতে
বিষাদের বিষ জ্বলতে জ্বলতে বুঝেছি-

আমরা কেউই প্রেমে পড়িনি কোনোদিন,
আদতে আমরা প্রেমে পুড়েছি প্রত্যেকেই।

অথচ জীবনব্যাধি থেকে বাঁচতে আমাদের
প্রয়োজন ছিল কেবল একটা কাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর।

 

অভিজ্ঞতা

তন্ময় মোদক

মুহূর্ত ভাঙতে ভাঙতে যে সময়ের জন্ম হয়
তার কোলেপিঠে করে মানুষ হয়েছি আমি,
ঝরনা আর বৃষ্টি জলের শব্দের তারতম্য ধরে
আমি দেখেছি, নদীর চেয়ে বড় চোরানদী বয়ে
চলে ভিতর ভিতর, তাকে মুঠোতে ধরতে গিয়ে
জেনেছি বারবার, ইশ্বর এখন প্রবহমান–

জলের জঙ্গলে খুঁজতে গিয়ে অনাহূত পাখি
আমি বেশ কবার হারিয়ে গেছি তর্পন করতলে
সেখানে ফুটতে দেখেছি অনিন্দ বিষফুল–
এখনো বেঁচে আছি মানে আমি বহু বহু ঝড়ে
টিকে থাকা এক কলির ভীষ্মদেব–

 

ভুল অংকে জ্বলন্ত কৈশোর
আতিক আনন্দ কর

মরতে গিয়ে কতবার এসেছি ফিরে যদি জানতে,
যদি জানতে কতোটা অন্ধকারে হেঁটে হয়েছে দুটি চোখ নিঃস্ব কাতর!
চারিদিকে দাঙ্গা আগুন, সভা সেমিনার, মিছিল মিটিং,
শরতে ঘর পলাতক ছেলের প্রথম ভুল কবিতা বিলাস।
কৈশোর স্মৃতিতে মক্তবে বরইয়ের ডালে বসে থাকা উদাস শালিক শুনে কোরানের সুর!
সন্ধ্যা হ্যারিকেনে নিভু নিভু আলোয় গলা ছেড়ে বাংলা পাঠ,
ছোট বোনের কান্না জোনাক লোভে!
আগুনের আঁচ দাপিয়ে বেড়ায় মায়ের মুখে,
ঘামে ভেজা শাড়ি গল্প বলে কবিতার!
দরজার কড়া নড়ে বাবার ঘরে প্রবেশ
আমি সুবোধ গর্দভ সেজে অংক কষি-
কতটুকু ঘাম লেগে আছে মা আর বাবার বুকে,
সাঁই করে ছুটে আসে বাবার হাতের ক্ষিপ্ত ঘোড়া,
অংকে ভুল শরীরে লাল দাগ আমার জ্বলত কৈশোর!

দিনে দিনে অসংখ্য চোখ পেরিয়ে,
কবিতার সবুজ ফসলের মাঠ ডিঙ্গিয়ে শেষ লগ্নে পৌঁছে;
বন্দি হয়ে আছি এক দিয়াশলাই এর বাক্সে!
এখন রাত কাটে নীরবে নির্মম!
যে লোভে ছেড়েছি ঘর, মায়ের ঘ্রাণ, দাদার কবর, বাবার মুখ,
আজ সেখানে শুধু বিষাদেরই বাস!
ঘুমহীন চোখে ঘাম জমা ললাটে খুঁজে ফিরি হারানো কৈশোর,
মায়ের সজল চোখ, বোনের এক্কা দুক্কার ছক,
বাবার হাতে ক্ষিপ্ত ঘোড়া অংকে ভুল শরীরে লাল দাগ!
নিজের পাপের ভারে ভেঙ্গে গেছে নিজেরই শরীর,
শুয়ে থেকে নিজ লাশের পাশে
আমার কৈশোর হাসে,
শরতের প্রথম ভুলের জন্য,
কবিতা লোভে ঘর পালাবার জন্য!

তোমরা কষ্টের কথা বলো?
দুঃখের কথা বলো?
বেঁচে থেকেও মরে যাবার কষ্ট নিয়ে-
আদৌ কি তোমরা চল?

 

অ্যালেন সাইফুলের দুটি কবিতা

১.

তোমার চলে যাবার পথে
আমার ঘর। বৃষ্টি এলে
একটু বসে যেও

যেভাবে হঠাৎ
মুসাফির এসে বসে
পানি দিলে খায়
গা মুছে চুলও আঁচড়ায়

আর বৃষ্টি শেষে থাকতে বললে
একটু হেসে
‘আসি’ বলে চলে যায়।

২.

ধানক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে যাবার মতো
অভাবের বুক চিরে নিশ্চয়ই একদিন হেঁটে যাবো

বাড়ি থেকে দূরে
প্যারিসে কিংবা ফ্রাঙ্কফুর্টে
ভরা বাদলের কোনো দিন দেখে
হয়তোবা কবরে
যেখানেই যাই, যাবো

অভাবের বুক চিরে, হীনমন্যতা
আর বাড়ি থেকে পালিয়ে। দূরে
ভরা বাদলের কোনো দিন দেখে
যাবো, কবির মতো অহংকারে।

 

মেঘদূত
কায়েস মাহমুদ

আমার সমস্ত জাহাজ বন্দর ছেড়ে গ্যাছে
নোঙ্গর করে নি কোনদিন
এক ঝড়ের রাতে মাস্তুলের ওপর থেকে স্পটলাইট ফেলে তোমারে খুজি
তোমার কাছে গেলে তবেই কেবল ফেলা যায় নোঙ্গর
মুহুর্তের ভুলে পালটে গেলে দিক
মাটির সঙ্গে ঝড়ের ধ্রুপদি ক্লাইম্যাক্সে ছিটকে যাবো দূরে
এমন সময় টলমল করে পাটাতন
হাল ধরে বসে আছি আমিই কেবল একমাত্র সারেঙ
মেঘেদের দিকে তাকিয়ে আকাশের রঙ চেনা যায়
রবীন্দ্রনাথ মেঘদূতের যে ব্যাখা করেছিলেন তা অনেকটাই তার নিজস্ব
ঝড়ের রাতে তিনি কখনো ধরেন নি হাল
এমন ঝড়ের রাতেই মেঘেদের কেবল চেনা যায়
চেনা সমুদ্রে বসে থাকে জীবনের অপেক্ষায়।

 

বাতাস হাসানো ভুল
হিমাদ্রী চৌধুরী

অস্থির এই সময় বাঁশের সাঁকো, বাতাসেও
হেলেদুলে ওঠে জলের ছায়ায়। প্রজ্ঞাপন
ঘোষণার পরেও থেমে নেই চলাচল। যদিও
থামার প্রয়োজন অতি, কিন্তু বেমালুম ভুলে
সিগন্যাল, সড়কের ফাঁদে পা দিয়ে হাঁটে ঘড়ি।
বহুবার মৃত্যু এড়িয়ে এই সহসা শিরায় শিরায়
খোলা তলোয়ার— যেনবা কেটে নিয়ে রক্তফল
হবে চাষ অদ্ভুত পপি ফুল। কোন ইশারায় খুলে
পড়ে শাড়ি নিশপিশ হাতের কাছে, জানা নাই,
শুধু কামনা বনের দিকে কিছু আগুন হেসে খুন
খবর পাই লোম ঘুম ভাঙা সুটকেসে। লুটিয়ে
পড়ে থাকে এতো সৌরভ তবু হয়না আঁধার ভেদ
কত তপস্যা শেষে জাগবে কুম্ভকর্ণ ঋতু এই
ইবাদতের ফসল মাঠে—সময় তো বয়ে যায়।

কাঁপে ওষ্ঠাগত শব্দ। পরিশুদ্ধ আয়াত হতে নির্গত
বাষ্প বহর।অকারণ তুচ্ছ কিছু পরশে অভ্যাস
হতে গিয়ে টুপ করে চায়ের কাপে খঁসে পড়ে বিস্কুট!
জিহ্বা পেতে রথীদের ধুলো চেটে মহা ভাবে থাকে
ধূর্ত সন্যাসীর শ্বাস—যেভাবে যোগানুশীলনে কম্পাসে
দিক বদলে ঘূর্ণির ঝড় হয়ে যায়।পথে তো ছাপ নেই
পা ই স্বয়ং ছাপাখানা, রাখতেই অজানাতে পদ যুগল
হয়ে যায় চিহ্নের ইতিহাস।প্রবাদ মাফিক কে বাঁধিবে
বিড়ালের গলায় ঘন্টাহার? ভয়ে বুদবুদ উঠে নাকে
বিছানার কাছে হারানো সুরের বাঁশি। এতোদিন পরে
কোন অজানা হতে উঠে এলো গুপ্ত ঘাতক—জানা নাই।থামানো প্রয়োজন, ইরেজারে ভুল মোচনের শাপ
থাকলে মজ্জার ভিতরের শীতকাল গুলো যেতো মুছে
দেয়া।চাওয়াতে যদি হতো পাওয়া বর, হয়তো মিটে
যেতো সময় সাঁকোর ন্যাক্কার বাতাস হাসানো ভুল।

 

পালাক্রমে জীবন
অনিক মন্ডল

ক্রমশঃ বদলে যাচ্ছে আমার মন।
তোমার অনাগত বাচ্চা কখনও জানবে না শেষ কবে সঙ্গম হয়েছিলো আমাদের।
তোমার বর্তমান প্রেমিক’কে বলিও
তোমার বুকের মাঝে থাকা তিলের মালিক একমাত্র আমি’ই!

আজও গুলিয়ে ফেলি তোমার ঠোঁটের স্বাদের সাথে জাফরানের স্বাদ।

আমার পাশে শুয়ে আছে এক শাওতালি মেয়ে।
তার বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে কবিতা!
এখানে ক্রমশ নেমে আসে অন্ধকার,
জন্ম নেয় একটা কবিতা!
একটা কবিতা,
ক্রমশ তৈরি হয় একটা জানোয়ার।

তখনও ভোর ঘুমিয়ে ছিলো!
আমার থ্যাঁতলানো মগজ মনে করতে পারছে না,
যিশু খ্রিস্টের স্ত্রী তোমার চেয়ে সুন্দরী ছিলো কিনা!

এখানে আত্মহত্যা এক উৎসবের নাম!
তবে আত্মহত্যার আগে নিজের প্রিয়জনকে কেও চিঠি লিখে না!
লিখে একটা কবিতা!
কবিতার জন্য যারা আত্মহত্যা করে,
তাদের উপর আমার খুব ঈর্ষা হয়!

 

প্রিয় কুসুমিতা
সাইফুল ইসলাম

জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের মতো
শক্তিশালী মনে হয় তোমাকে,
যেকোনো প্রস্তাবে তুমি ভেটো প্রদান
করতে পারো, সেই ক্ষমতা তোমার আছে।
ইচ্ছে করলেই তুমি পারমাণবিক বোমা
নিক্ষেপ করে উড়িয়ে দিতে পারো আমায়;
আমি কিছু মনে করবো না।

শুনো, আকর্ষণীয় কুসুমিতা
তোমাকে যেদিন লাল শাড়িতে দেখেছিলাম
সেদিন থেকেই,
হৃদয়ের পাসওয়ার্ড ভুলে গেছি।
তোমার অনলে পুড়ে গেছে গোপন কূটনৈতিক নথিপত্র !
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হারিয়ে গেছে
আমার আধিপত্য,
পররাষ্ট্র নীতিতে আজ বড্ড গোলমাল
তোমার কারণে শুধুমাত্র তোমার কারণে পৃথিবীতে আজ এতো দ্বন্দ্ব-সংঘাত!
একমেরুকরণ, বহুমেরুকরণ রাজনীতি চলছে।
তোমার ভূখন্ড দখলে নেওয়ার জন্য,
এই বুঝি শুরু হয়ে গেলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ!

তবে কি তোমাকে পাওয়ার জন্য
করতে হবে অস্ত্র উৎপাদন,নিতে হবে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ?

প্রিয় কুসুমিতা, তোমার জন্য না-হয়
নিজেকে জলাঞ্জলি দিলুম,
এই আমি হাসতে হাসতে চললুম
নিজের মৃত্যুর কবর খুঁড়তে।

 

তুমি কিংবা মৃত্যুর ইতিকথা

শহিদুল হক সৈকত

কার্ফিউগ্রস্ত শহরে কালবৈশাখীর দিনে যাবতীয় দৃশ্যে অন্ধকার নেমে আসে,
প্রেমিকার হুকুমে দাড়ি রাখা শয়তান মানুষের লীলাখেলা দেখে হাসে।
আমার কেবল মনেহয় এখানে আলো এলে ঝলসে যাবে তোমার চোখ,
যাবতীয় দুঃখে ছেয়ে যাবে তোমার মুখ।
এখানে বরং অন্ধকারই থাকুক, বিধাতা তোমাকে ভালো রাখুক।
আমি পথে পথে তোমার নাম গাইতে গাইতে দেখি
হত্যার বিচার চেয়ে দেয়ালে লাগানো পোস্টারে আঙ্গুলের চুন মুছে যাওয়া মানুষদের শহরে যাবতীয় কবিতা নির্বিবাদী পাখিদের মতো উড়ে যায় টবের মাটিতে পা ডুবিয়ে দুইহাত দুদিকে ছড়িয়ে থাকা মানব গাছটি ছেড়ে। কারো উড়ে যাওয়ায় গাছেরা শোকাহত হয়? অথবা গাছেদের মৃত্যুতে কষ্ট পায় পাখিরা, নোনা জলে ভিজে আঁখিরা?

 

নারী
রাফা মুনিয়া

যেই নারীটিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছি, তার চওড়া সিঁথিতে গনগনে সূর্যের মতো ফুটে থাকতো সিঁদুর।

খুব ছোটবেলায় একবার মায়ের সিঁথিতে সিঁদুর দেখে আমার সবচেয়ে ছোট বোনটি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো- সিঁদুর কেন লাল হয়,
আমাদের প্রচণ্ড ধার্মিক মা সেই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পেরে খুব রেগে উঠেছিলেন, ঠিক যেমন কোনো রান্না পুড়ে গেলে মা অকারণেই আমাদের কাউকে ধরে অকারণে পেটাতেন,
কিংবা আমাদের গরীব বাবার পকেটে পয়সা ফুরিয়ে আসলে বেধড়ক পেটাতেন আমাদের দাপুটে মাকে।
পুরো গাঁয়ে আমাদের যে মায়ের নাম ছিলো জাঁদরেল হিসেবে, আমাদের সেই মা তাঁর শীর্ণকায় পতিদেবতার হাতে নিষ্ঠাভরে মার খেতেন,
তিনি ঠিক তেমন করে আর্তনাদ করতেন, যেমন করে পিঠে মায়ের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালাকাঠের আঘাতে কাঁদতো আমাদের পোষা বেড়াল মিনি-
আমার মায়ের কপাল ফেটে রক্ত মিশে যেতো সিঁথির সিঁদুর, যা প্রতিদিন স্নানের পর মা ভীষণ যত্নে পরতেন, অক্ষম স্বামীর অহংকারকে মুকুট ভেবে নিয়ে।

বহু বছর পর একটি নারীকে প্রবলভাবে ভালোবাসার পর আমার মনে হয়েছিলো আমার ভীষণ আদরের ছোট বোনটির করা প্রশ্নের উত্তর আমি জেনে গেছি।
তাকে ফোন করে বলেছিলাম, খুকি, মনে পড়ে তোর সেই যে জিজ্ঞাসার কথা, সিঁদুর কেন লাল হয়?
আমাদের খুকি ভীষণ নরম গলায় সেদিন উত্তর দিয়েছিলো , দাদা! সিঁদুর নিয়ে আর কোনো জিজ্ঞাসা যে আমার আর অবশিষ্ট নেই?
আমার কল্পনায় তখন ভেসে উঠলো আমাদের সবচেয়ে আদরের সবচেয়ে ছোট বোনটির খালি সিঁথি,
লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যে একটা খুপড়ি ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছে বহুদিন।
আমাদের গরীব বাবা পারেনি খুকির হবু বরের আবদার মেটাতে,
ভীষণ তেজী খুকিও বলেছিলো, রোববারের হাটে ওঠা কোনো মূলো-লাউ-কুমড়ো আমি নই যে টাকার দামে কেউ কিনে নেবে আমায়-
সেই তেজের প্রতিশোধ নিতেই কিনা কে জানে,
লগ্নের পর লগ্ন বয়ে গেলো, খুকির কপালে সিঁদুর উঠলো না।
বাবাকে সেদিনের মতো কাঁদতে আমরা আর কেউ দেখিনি, মণ্ডপের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে শিশুদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে তিনি কেবল মাতম করে যাচ্ছিলেন খুকির নাম ধরে।
খুকির শূণ্য সিঁথি দেখে আমার ইদানীং কেবল মনে হয় ওর সাদাটে সিঁথিতে আমার গরীব বাবার অক্ষমতা আর চোখের জল লেগে আছে,
তাই এখন আর খুকি জানতে চায় না সিঁদুরের রঙের মানে,
জীবনের নির্দয়তা আর মানুষের নিষ্ঠুরতার মানে জানতে জানতেই আমাদের খুকির বেঁচে থাকার সাধ মিটে গেছে।

নারীটিকে ভালোবাসবার পর,
আমি জেনেছি সিঁদুরের রঙ কেন লাল, কেন বুকে সুখের মতো ব্যথা বেজে ওঠে, কেন বহু বছর আগে মাথা নিচু করে উত্তমকাকা দিনমান দাঁড়িয়ে থাকতো বেলিফুল গাছটার নিচে থাকতো সারাগায়ে ময়লা মেখে, কেন আমার বড় বৌদি আমার চালচুলোহীন ভাইটির হাত ধরে চলে এসেছিলেন তাঁর ভীষণ বড়লোক পিতার সহায় সম্পদ ফেলে, কেন আমার অফিসের এমদাদ সাহেব অফিসশেষের আড্ডা ছেড়ে বাড়ি চলে যান-
সব জেনেছি, নারীটিকে ভালোবাসার পর।
নারীটিকে ভালোবেসে আমি মানসিক ভারসাম্য হারাইনি, ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাইনি, তাড়া করে ঘরেও ফিরিনি ভালোবাসার নারীটির কাছে-
বরং দেখেছি গনগনে আগুনরঙা সিঁদুরের বিদীর্ণ করা লাল রঙ,
শুনতে পেরেছি সিঁদুরের নিঃশব্দ চিৎকার,
শাখা পলার অদৃশ্য আঘাতে হয়েছি আহত,
ভীষণ লাল সিঁদুর সীমানা গড়ে দিয়েছে আমার আর আমার সবচেয়ে ভালোবাসার নারীটির মধ্যে,
এই সীমানা ভেদ করে একে অপরের হাত ধরার সামর্থ্য আমাদের নেই,
আমার ভালোবাসার নারীটির সিঁথির সিঁদুরে ছড়ি ঘুরিয়ে প্রতাপের সাথে সেই সীমানা রক্ষা করে তার দুশ্চরিত্র স্বামী।

এবং আমার মাঝে মাঝে মনে হয়,
তার সিঁদুরের সাথে মিশে আছে একটি ক্ষতবিক্ষত প্রেমিকহৃদয় থেকে ক্ষরিত হওয়া তাজা রক্ত,
তাই এই পৃথিবীতে আমার ভালোবাসার নারীর সিঁথির সিঁদুরের চেয়ে লাল আর কোনো কিছু নেই।

 

দ্বিপায়ণ দীপ্ত-র দুটি কবিতা

বিভ্রম-
যে পথে সে হাঁটতে চায়,
আমি সেই পথে হাঁটবো না বলে ভাবি।
অসহায় আত্নসমর্পণে আসে বিভৎস কল্পনা
ঝড়ো বাতাস আমায় ঝাপটা দেয়
এমন জোৎস্নারাতে মস্তিষ্ক স্থবির হয়ে যায়
ভুলে যাই আমি বিগত রাতের পাপের কথা
আমার পরিচিত পথের ঘাসফুল বিস্ময়ে ছুঁড়ে দেয় প্রশ্ন
সেই বিক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আমার
সে চলে যায় তার আপন পথে আমাকে নিঃসঙ্গ রেখে,
নির্বাক আমি দাঁড়িয়ে থাকি ঝুঁকিপূর্ণ সাকোর মাঝামাঝি।

আশ্রয় –
পৃথিবীর সবকিছু মিথ্যে হয়ে যায়
যখন দুচোখে নেমে আসে ঘন আন্ধার
মনে হয় ভেসে আছে
বিশাল জলরাশির মাঝে
কচুরিপানার জীবন নিয়ে।
মানুষ আকৃতির এই দিনযাপনে,
যদি কখনো কৃপণ হয়ে যায়
আমার চাওয়া পাওয়ার যত হাত
প্রচন্ড শুষ্কতায় নষ্ট হবে
কচুরিপানার এই জীবন।

 

ফিল্ম
দেবজ্যোতি দাশ টুটন

যাযাবর জীবন, পোড়ামুখো কবি,
কবিতার লোভে খুইয়েছে সব-ই,
পুরান দেয়ালিকা, প্রেমিকার গন্ধ,
আলোর শোকে জানালা বন্ধ ।

যুবক বেকার, স্বপ্ন সুদূর,
রাত নামে, কেটে যায় ঘোর,
অগণিত ছায়াছবি, শহুরে পোস্টার,
মুখ লুকিয়ে তবু কাঁদে লাখো-কোটি অ্যাক্টর ।

জান-প্রাণ-মানহীন দালান যায় দাঁড়িয়ে,
আকাশটা ছুঁয়ে ফেলে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে,
বেঁচে যায় বুড়ো আঙুল, বেঁচে যায় দালান,
শহরে কোণে পচে তবু দালানের ভগবান ।

 

আকাশচারী
অনুস্বার

আমাদের হৃদয়ে সুখ জমা হয়,
সুখ থেকে সুর তুলে গুনগুনিয়ে উঠে আমাদের হৃদয়,
তুমি বল পাখি; সব পাখি গান গায় না।
উৎসুক তৃষ্ণার্ত দাঁড়কাক হয়ে,
কোন কোন হৃদয় কোকিলের গান শুনে;
সব কাক কোকিল হতে পারে না।
তবুও পৃথিবীতে আমার মতো- তোমার মতো- যত প্রাণের ঠেলাঠেলি,
সব প্রাণ পাখি হতে চায়; কোন না কোন পাখি হতে চায় সব,
সব থেকে এক অন্তিমে শব হয়ে যাই আমরা,
তবুও আমাদের পেছনে অসংখ্য তাড়নার ভিড়; লম্বা লোহার শেকলের মতো,
তাদের মাঝেই কোনোক্রমে দু হাত পা তুলে ঘাঁটি গাড়ে,
আমাদের আকাশচারী হবার তাড়না।

এই পৃথিবী কি অদ্ভুত সুন্দর!
অমনই সুন্দর, যা বিমর্ষ করে দিতে পারে প্রাণ ।
বারবার চলে যেতে চাই,
তবুও আঁকড়ে ধরে, গভীর থেকে;
শেকড় থেকে আঁকড়ে ধরে।
মনে হয়,
একদিন আমরাও পাখি হব নিশ্চয়ই!

প্রিয়তমা, অসংখ্য তাড়না আমাকেও তাড়া করে বেড়িয়েছে বহুকাল,
আমার শরীরে- মগজে- অসংখ্য চেতনা,
যাদের মাঝে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি বারবার,
আমি তো কেবল শান্তি খুঁজেছি , কেবলই শান্তি,
শীতল খোয়াইয়ের তীর ধরে ধরে গিয়ে সবচে নির্জন প্রান্তরে,
যাকে পেয়েছি; তোমার মুখ অবয়বে;
কোমলতা যেখানে আকাশচুম্বী হয়েছে; প্রিয়তমা,
কেবল তোমাকে ভালোবাসি বলার জন্য হলেও তো বার বার জন্ম নেয়া যায়।

 

চাষার দুক্ষু্
জয় দেবনাথ

আমার কৃষকরা যদি ক্ষেতে ফসল না ফলাইতে পারে আমরা খাইমু কি?
সারের দাম,সেচের ডিজেলের দাম যদি হুরহুরাইয়া বাড়ে আমরা এত টাকা পাইমু কই?
ভালো মানের বীজও নাই;যাও আছে কোম্পানির সিল মাইরা দাম বেশি।
শিলাবৃষ্টি,বন্যা,খরা,পোকামাকড় কত ঝড়ের পরেও ধানগাছ মাথা তুইল্লা দাঁড়ায়।
কালবৈশাখী আর ভয়ঙ্কর রৌদ্রের জ্বালা সহ্য করেও ধান আনি ঘরে।
কখনও উজানের পানি সব ভাসাইয়া নেয়।

ভাসাইয়া নেয় সোনার স্বপ্ন।

আমার কৃষক ভাইরা ধান কত টাকা মন বিক্রি করে জানেন?

জানতে হবে না!

আপনারা উন্নয়ন করেন;অর্থনীতির চাকায় তেল দেন।
কৃষকদের কথা ভাবতে হবে না।
ঠিক যেমন ভাবেনি আপনাদের অগ্রজরা।

আমার কৃষক ভাইয়ের ধানের টাকায় বছর ঘুরায় না।
সে আবারও দিনমজুর।
তারাই আজ পরিবারের দিকে চেয়ে তোমাদের বিলাসবহুল শহরের শ্রমিক।
কথিত উন্নয়নে কৃষকের টেক্সের টাকায় তৈরি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে;টাকার অভাবে পড়তে পারে না কৃষকসন্তান।
কৃষকের জন্য লোকদেখানো বরাদ্দকৃত টাকা কৃষকের হাতে পৌছানোর আগেই;আপনাদের পকেটে ডুকে যায়।
কৃষকের ঘাম কিনতে চেয়েও আপনারা তার সঠিক মূল্য দিতে পারেননি।

আমার কৃষকের কথা কেউ বলে না।
সংসদে কৃষকের কোন প্রতিনিধি নেই।
বিগত দিনগুলোতে কৃষকদের নিয়ে কোন সম্মেলন হয়নি।

আসলে কৃষকের কোন ভাই নেই!

অনাবৃষ্টির দিনে আইলে দাড়িয়ে; কৃষক যখন আসমানের দিকে চেয়ে দু’হাত তুলে বলে
তুমিই রিজিকের মালিক খোদা…
সত্যি খোদা ছাড়া কৃষকের আর কেউ নেই।

 

সম্পাদক: নাজমুস সাকিব

সহ-সম্পাদক: ঝলক গোপ পুলক

© ডাকপিয়ন